আজ পহেলা বৈশাখ, শুভ নববর্ষ

মঙ্গলবার এপ্রিল ১৪, ২০২০ ২:৫৩ অপরাহ্ণ
লেখাটি এই যাবৎ ২২ বার পঠিত হয়েছে

বাংলা বর্ষগণনার উৎপত্তির বিষয়ে ব্যাপক বিতর্কিত দুইটি অভিমত হচ্ছে: ১. বাংলা সনের উৎপত্তি হয়েছে সম্রাট আকবরের মাধ্যমে, ২. বাংলা সন প্রবর্তন করেন রাজা শশাঙ্ক। কম উল্লিখিত আরেকটি অভিমত রয়েছে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের অনুকূলে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি আসলে ভারতবর্ষের বহুমাত্রিক ক্যালেন্ডার ব্যবস্থার একটি ভার্শন। বাংলা সনের অঙ্কটি যদি সম্রাট আকবর প্রবর্তিত তারিখ-ই ইলাহী থেকে এসেও থাকে, তবু এটা নিশ্চিত যে বাংলা মাসের নাম ও দিনগণনা পদ্ধতি এসেছে সনাতন ভারতবর্ষীয় ঐতিহ্য থেকে। তাহলে এগুলোর উদ্ভব কবে?

সম্রাট আকবর ১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি কার্যে হিজরি সনের পরিবর্তে তারিখ-ই ইলাহী চালু করেন, কিন্তু এটি আরো তিরিশ বছর আগে তার সিংহাসনে আরোহনের বছর (১৫৫৬ খ্রি.) থেকে কার্যকর বলে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হিজরী ৯৬৩ সন ছিল, দুইটি সালের জন্মের পার্থক্য ৫৯৩ বছর। তারিখ-ই ইলাহী জন্ম থেকেই ৯৬৩ বছর বয়স নিয়ে যাত্রা করে, এরপর থেকে সালটি বিশুদ্ধ সৌর সন হিসেবে গণিত হয়। এই গণনাটি বঙ্গাব্দের অঙ্কসংখ্যার সঙ্গে (খ্রিষ্টাব্দ মাইনাস ৫৯৩) মিলে যায়। এখান থেকে বলা যায় যে তারিখ-ই ইলাহী থেকেই বঙ্গাব্দ এসেছে। আবার এমনও হতে পারে যে বঙ্গাব্দ (১) শুরু হয়েছে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দেই (শশাঙ্কের রাজত্বকালে), সেটা কাকতালীয়ভাবে তারিখ-ই ইলাহীর সঙ্গে মিলে গেছে।

তারিখ-ই ইলাহী থেকে বঙ্গাব্দ সূচনার তত্ত্বটি সমর্থন করেন ড. অমর্ত্য সেন। যাই হোক, একটা গ্যাপ শুরু থেকেই আছে। ইলাহী বছরপদ্ধতি হচ্ছে মূলত ইরানীয় বছর পদ্ধতি যা বাসন্ত বিষুব (Vernal equinox, গ্রেগরীয় ২১ মার্চ) থেকে শুরু হয়। তদানীন্তন জুলিয়ান মানে সেটা ছিল ১১ মার্চ (তখনও গ্রেগরীয় পদ্ধতি চালু হয় নি)। মোগল রাজধানীতে তখন খুব ধুমধামে নওরোজ (ইরানী নববর্ষ) পালিত হত; শাহজাদা সেলিম (পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর) তার প্রণয়িনী নূরজাহানের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন এক নওরোজের মেলায়। অন্যদিকে ঐ সময় পহেলা বৈশাখ পড়ত ৭/৮ এপ্রিল (জুলিয়ান ২৮ মার্চ)। সুতরাং ইলাহী বছর আর বঙ্গাব্দ অভিন্ন হতে পারে না, তবে বর্ষসংখ্যাটি কমন হতে পারে।

আসলে মোগল দরবারে ইলাহী সন প্রচলিত হলেও প্রদেশে গভর্নরগণ স্থানীয় ফসলি সন অনুসরণ করতেন। হায়দারাবাদে ফসলি সন শুরু হয় আষাঢ় মাস থেকে, বাংলা প্রদেশে বৈশাখ থেকে। হতে পারে যে সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান (c. ১৬১০) পয়লা বৈশাখে খাজনা আদায় ও হালখাতা প্রবর্তন করেন।

ইলাহী সনের মাসের মাসের নামগুলো ফারসি (ফার্ভার্দিন থেকে এসফান্দ)। কিন্তু মাসগুলোর দিনসংখ্যা ভারতবর্ষীয় সৌরমাসের অনুরূপ। রাশিসংক্রান্তি অনুসারে মাসগুলোর দিনসংখ্যা ২৯ থেকে ৩২ দিন পর্যন্ত হতে পারে। ইরানে ১০৭৯ খ্রিষ্টাব্দে Jalali Calendar প্রবর্তিত হয় যা এযাবৎ বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত (ক্রান্তীয়) সৌর ক্যালেন্ডার। বহুবিদ ওমর খৈয়াম এই ক্যালেন্ডার প্রণয়ন কমিটির কর্ণধার ছিলেন। এতে মাসগণনার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল ভারতীয় ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ থেকে, কিন্তু একে ক্রান্তীয় (সায়ন বা Tropical) কাঠামোতে অ্যাডজাস্ট করা হয়। [উল্লেখ্য ১৯২৫ সালে ইরানীয় ক্যালেন্ডার সরল করা হয়, এটা সৌর হিজরী বা শামসী ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত]।

বাংলা তথা ভারতীয় মাসগুলো কিভাবে এলো? সব প্রাচীন সংস্কৃতিতেই প্রথমে চান্দ্র ক্যালেন্ডারের উদ্ভব ঘটে, সৌর ক্যালেন্ডার সভ্যতার অনেক পরের দিকের ঘটনা। কারণ ২৯/৩০ দিনে চান্দ্রমাসের হিসাব সহজেই রাখা যায়। অথর্ববেদে ১২টি মাসের নাম পাওয়া যায় (চৈত্র থেকে শুরু) : মধু, মাধব, শুক্র, শুচি, নভ, নভস্য, ঈশ, ঊর্জ, সহস, সহস্য, তপ, তপস্য। এগুলো সৌর মাস, না চান্দ্রমাস নিশ্চিত বলা যায় না। তবে পূজা-পার্বণে তিথি ও নক্ষত্র গণনা করা হত। বেদাঙ্গ জ্যোতিষ শাস্ত্রে প্রথম নক্ষত্রগুলোর তালিকা পাওয়া যায়। প্রথমদিকে নক্ষত্রচক্র গণা হত কৃত্তিকা থেকে, পরে অশ্বিনী থেকে গণা শুরু হয়। পূর্ণিমার দিন চন্দ্র যেই নক্ষত্রে থাকে তদনুসারে মাসের নাম হয়। চিত্রা, বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, (পূর্ব)আষাঢ়া, শ্রবণা, (উত্তর) ভাদ্রপদ, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা ও (উত্তর) ফল্গুনী নক্ষত্র থেকে যথাক্রমে চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র(পদ), আশ্বিন, কার্ত্তিক, মার্গশির (আরেক নাম অগ্রহায়ণ), পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন নাম এসেছে। এগুলো আসলে চান্দ্রমাসের নাম। যেমন হিন্দী বা মারাঠি বলয়ে ১ চৈত্র বলতে বোঝে চৈত্র (চান্দ্র)মাসের প্রতিপদ তিথি। কিন্তু বাংলা-আসাম-উড়িষ্যা ও পাঞ্জাবে এগুলো সৌরমাসের নাম। টেকনিক্যালি সৌরমাসের নাম হওয়া উচিৎ সৌররাশির নামে যেমন মেষ, বৃষ ইত্যাদি।

সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে (চতুর্থ শতাব্দী, দেখুন উইকিপিডিয়া) প্রথম নাক্ষত্র সৌরবৎসরের মান দেয়া হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা ১২ মিনিট ৩৬.৪ সেকেন্ড। আধুএফনিক হিসাবে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা ৯ মিনিট। সনাতন বাংলা পঞ্জিকায় এখনও সূর্যসিদ্ধান্ত মান ফলো করা হয়। অন্যদিকে ঋতু নির্ণায়ক ক্রান্তীয় বছরের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৯ মিনিট। বছরে এই ২০ (বা ২৩) মিনিটের পার্থক্যের কারণে সনাতন বছর ক্রান্তীয় বছর সাপেক্ষে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। যাই হোক, সৌরমাস শুরু হয় রবিসংক্রান্তি বা তার পরদিন থেকে। ২০২০ সালে মেষসংক্রান্তি হচ্ছে ১৩ এপ্রিল ২৩.০৫টায় (বাংলাদেশ সময়)। ফলে পয়লা বৈশাখ হচ্ছে ১৪ এপ্রিল। ২০০০-২০২৪ সময়কালে সনাতন পঞ্জিকামতে সাধারণত পয়লা বৈশাখ হচ্ছে ১৫ এপ্রিল। কেবল ইংরেজি লিপইয়ারগুলোতে বাংলাদেশের সাথে সনাতন পঞ্জিকাতেও নববর্ষ হচ্ছে ১৪ এপ্রিল। ২০২৪ সালের পর এটা আর কখনোই মিলবে না, এমনকি ২১০৩ সালে সনাতন পঞ্জিকানুসারে পয়লা বৈশাখ হবে ১৭ এপ্রিল। ফলে একটা সংস্কারের প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

ভাল কথা, পহেলা বৈশাখ কি শুধু বাংলাদেশেই নববর্ষ? না, এটা পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, নেপাল, উড়িষ্যা, শ্রীলঙ্কা, বার্মা ও থাইল্যান্ডেও নববর্ষ। হিন্দু ও বৌদ্ধ (থেরবাদী) সংস্কৃতিতে মূলত চান্দ্র ক্যালেন্ডার ফলো করা হলেও চৈত্র সংক্রান্তির হিসাব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এমনকি উড়িষ্যার বিলায়তী সন আর বঙ্গাব্দের অঙ্কসংখ্যাও এক, তবে উড়িয়া তারিখ শুরু হয় সনাতন বাংলা তারিখের এক দিন আগে। বঙ্গাব্দকে উড়িষ্যায় কেন বিলায়তী সন বলে সেটা বুঝতে পারলে বাংলা বর্ষপঞ্জির সঠিক হদিস বের করা সহজ হতে পারে।

লেখক: তারেক মাহমুদ, ব্যাংকার৷

ডেস্ক / এমজিজে / ২০২০ / ০৪১৪
মন চায় হারিয়ে যাই

শৈশব জীবনে ফিরে যাবার কোন মন্ত্র আছে কিনা তাই খুজছি আজকাল। কেন জানি মন চায় হারিয়ে যেতে সেই ছোটবেলায়। সারাখন [বিস্তারিত]

এই পচন রোধ করতে হবে

মানসিক রোগী আর যৌন বিকারগ্রস্ত লোকেরা শিক্ষকতা করার অযোগ্য৷ এদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করুন৷ সরকার এই কাজ করবে না, [বিস্তারিত]

চলে গেলেন ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক কলিম খান

ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধির অন্যতম রূপকার, ভাষাবিদ ও দার্শনিক কলিম খান আর আমাদের মধ্যে নাই। কিছুদিন যাবৎ তিনি দুরারোগ্য রক্তের ক্যান্সারে (AML) [বিস্তারিত]

বঙ্গবন্ধু: পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের কবিতা

১৬ই মার্চ, ১৯৭১ সন৷ পল্লীকবি জসিম উদ্দিন লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা বঙ্গবন্ধু৷ ক্ষমতালোভী হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের বীভৎসতা, হত্যাযজ্ঞ, শহর-গ্রাম, বাড়ি-বিপণীকেন্দ্র [বিস্তারিত]

মতামত জানান